সাকিব আনোয়ার আরও বলেন, এজেন্সি ব্যবসায় দেশীয় মালিকানা বাধ্যতামূলক করার নজির বাংলাদেশে নতুন নয়। যেখানে এটা করা হয়েছে সেখানেই সক্ষমতা, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগ বেড়েছে। সেই তুলনায় ৬০ শতাংশের দাবি অত্যন্ত মধ্যপন্থী, এটি বিদেশি অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করে না, কেবল নিয়ন্ত্রণ দেশীয় হাতে রাখে।
ফ্রেইড ফরওয়ার্ডিং, শিপিং এজেন্সি, সিঅ্যান্ডএফ এবং কুরিয়ার এক্সপ্রেস—এই চার উপখাতে অভিন্ন ৬০: ৪০ ইকুইটি কাঠামো, শেয়ার, লভ্যাংশ অধিকার ও পর্ষদের ভোটাধিকার তিন স্তরেই দেশীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাসহ ছয়টি প্রস্তাব করেন সাকিব আনোয়ার। বাকি পাঁচ প্রস্তাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিদেশি অংশীদারত্বযুক্ত লাইসেন্সধারীর জন্য ৫ থেকে ১০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার অবরুদ্ধ হিসাবে সংরক্ষণ এবং তার ৪০ শতাংশ দুই বছরের মধ্যে গুদাম, সরঞ্জাম ও পরিবহনে বিনিয়োগ করা।
বক্তারা কী বলেন
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, ‘ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠান প্রায় কোনো বিনিয়োগ না করেই মুনাফা নিয়ে যাচ্ছে। তবু দেশীয় প্রতিষ্ঠানকে সুরক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। এখন যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৬০ শতাংশ থেকে ৪৯ শতাংশে নামিয়ে আনা হচ্ছে, এটা সারপ্রাইজিং। এ ক্ষেত্রে আমাদের কোনো সচেতনতা নেই, সেটি খুবই দুঃখজনক। বিষয়টি নিয়ে বড় পরিসরে আলোচনা দরকার।’
বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরওয়ার্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বাফা) সভাপতি মো. আরিফুল আহসান বলেন, ‘আমাদের সংগঠনে ১ হাজার ২৫০ সদস্যের মধ্যে ১৩টি বিদেশি মালিকানা ও ৩০-৩৫টি যৌথ মালিকানার রয়েছে। তারাই ৮০ শতাংশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। বাকি ২০ শতাংশ করে দেশীয় প্রতিষ্ঠান। অথচ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ বলতে কিছুই নেই। ব্যবসায় যা মুনাফা হয়, তা তারা বিদেশে নিয়ে যায়। এখানে কোনো বিদেশি বিনিয়োগের কিছু নেই। তারপরও কেন বিদেশি কোম্পানিকে সুবিধা দিতে আগ্রহ, আমাদের বোধগম্য নয়।’
ইন্টারন্যাশনাল এয়ার এক্সপ্রেস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (আইএইএবি) সভাপতি কবির হোসেন বলেন, দেশে বিদেশি বিনিয়োগের দরকার। তবে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে দরকার বিদেশি বিনিয়োগ নেই। তার কারণ একই অফিস, লোক ও জ্ঞান নিয়ে কার্যকর পরিচালনা করে বিদেশি কোম্পানি। এত দিন দেশীয় এজেন্টরা কাজটি করত, এখন করছে বিদেশি কোম্পানি। পার্থক্য কিছু নেই।
আরআইএফ লাইনের প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা মো. কামরুজ্জামান বলেন, ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের লাইসেন্স হস্তান্তর করা যায় না। অভিজ্ঞতা ছাড়া কাউকে লাইসেন্স দেওয়া হয় না। সে জন্য নতুন প্রজন্ম এই ব্যবসায় আসছে না। এতে খাতটি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তিনি বলেন, আশির দশকে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা পণ্য রপ্তানি করতে অনেকে মিলে জাহাজ ভাড়া করতেন। তারপর দেশীয় উদ্যোক্তারা ধীরে ধীরে ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ের ব্যবসা গড়ে তোলেন। এই উদ্যোক্তাদের টিকিয়ে রাখতে সুরক্ষা দিতে হবে।
আইনজীবী এম সাকিবুজ্জামান বলেন, সরকার পরিবর্তন হলেই স্থানীয় এজেন্টরা দৌড়ের ওপর থাকেন। ব্যবসা ও রাজনীতি এক হয়ে যাওয়ায় এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। তখন জাহাজে থাকা পণ্য কে হ্যান্ডেল করবে, তা নিয়ে বিদেশি ক্রেতাপ্রতিষ্ঠান দুশ্চিন্তায় থাকেন। এ জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং খাতে করপোরেট সংস্কৃতি গড়ে তোলা দরকার।
বাংলাদেশ চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সহসভাপতি এ টি এম আজিজুল আকিল বলেন, ‘বিদেশি বিনিয়োগ নাকি বাণিজ্য কোনটা চান, সেটি বিডাকে পরিষ্কার করতে হবে। বিনিয়োগ আনতে হলে সহজ বাণিজ্য বন্ধ করতে হবে। আমাদের দেশে অনেক মানুষ। ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কম টাকা লাগে। তাই এই খাত সুরক্ষিত রাখতে হবে।’
সংসদ সদস্য ফজল হুদা বলেন, ‘নওগাঁ থেকে কারওয়ান বাজারে এক ট্রাক আলু আনতে খরচ হয় ৩০ হাজার টাকা। নওগাঁ থেকে রেললাইন নির্মাণে বিনিয়োগ করতে চাইলে আমরা শতভাগ মালিকানার বিদেশি কোম্পানিকে স্বাগত জানাব। কিন্তু ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে কেন কাগজ বেঁচে খাবেন। আমরা মনে করি, যৌথ উদ্যোগে বিদেশি অংশ ৪০ শতাংশ থাকা উচিত। ভারত ও শ্রীলঙ্কায়ও ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিংয়ে দেশি কোম্পানিকে সুরক্ষা দিতে বিদেশি কোম্পানির জন্য কঠোর নিয়মনীতি রয়েছে।’
আলোচনায় আরও বক্তব্য দেন সাবেক সচিব আবু আলম মো. শহীদ খান, দৈনিক ওয়াদার সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা স্ট্রিমের পরামর্শক সম্পাদক হাসান মামুন, আইসিএবির সাবেক সহসভাপতি মাহমুদ হুসাইন প্রমুখ। সঞ্চালনা করেন মাহমুদ অ্যান্ড সবুজ কোম্পানির অংশীদার সবুজ এইচ চৌধুরী।